(পুরানো কাগজের মাঝে খুজে পেলাম। সাত বছর আগে লিখা )
রিক্সার ওপর বসে আছি। রিক্সা রাস্তার ওপর বসে আছে। আর রিক্সাচালক বসে আছে রিক্সার পেছনে। বসে বসে অসহায় চেইনটাকে ক্লান্তিহীন ভাবে নাড়াচ্ছে। যশোর এয়ারপোর্ট থেকে ক্যান্টনমেন্ট গেট পর্যন্ত এই নিয়ে তৃতীয়বার। ভেবে দেখলাম, আমি যতবারই কোন ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যে বের হই, ততবারই কোন না কোনভাবে ধরা খাই। ভাগ্যের এই পরিহাস বড়ই নির্মম।
তাছাড়া আর কি’বা ব্যাখ্যা দিব, বলেন ? বিমান বাহিনীতে বৈমানিক হিসেবে কমিশন পাবার পর পোস্টিং হল যশোরে। ভেবেছিলাম উইকএন্ডে ঢাকায় গিয়ে রোশনীর সাথে ধুমসে ঘোরাঘুরি করব। কিন্তু প্রথম উইকএন্ডেই অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হলাম। কিন্তু, “লাভ কে লিয়ে কুচভী করেগা” মুভিটাও সেদিন দেখলাম; তাই কাউকে না বলে চুপি চুপি চলে আসি ঢাকা এবং ফিরে আসামত্রই ধরা খাই যথারীতি। ফলস্বরূপ, আগামী দুই মাস “নো উইকএন্ড”।
কিন্ত, সমস্য সেটা না। বর্তমান সমস্যা হল রোশনী এখন যশোরে। তাও মাত্র চারদিনের জন্য। ঠিক রবি থেকে বুধ – যে কয়দিন সারাদিন থাকে ফ্লাইং আর বিকেলে পি.টি.। দেখা করার সুযোগ কোথায়, বলুন তো? এখন, আমি যদি এই চরম সংকটে পি.টি. ফাঁকি দিয়ে শহরে যাই, তবে কি আমাকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় ? এবং পরপর তিনদিনই যদি স্কোয়াড্রন লীডার আসাদ স্যার( আমার ফ্লাইং ইন্স্ট্রাক্টর ) আমাকে দেখে ফেলে, সেটাকেও তো খুব অস্বাভাবিক বলা যায় না তাই না? ? তাই আজ সকালে স্যার যখন তাঁর গম্ভীর মুখটাকে আরও গম্ভীর করে ঠান্ডা গলায় বল্লেন, “পি.টি. টাইমে যেন কাউকে শহরে না দেখি, ওকে ? আদারওয়াইজ, ইউ অল উইল হ্যাভ দ্য জোক”– তখন ব্যাপারটাকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই নেই। তাই আজ চতুর্থবারের মত পি.টি. টাইমে আমার শহরে আসাটা নিশ্চই আপনাদের কাছেও স্বাভাবিক লাগছে।
“নাইমা পড়েন, রিস্কা আর যাবেনানে।” ঊর্ধমুখি রিক্সাচালকের উদাসী কথায় আবার রাস্তায় ফিরে আসি।পকেট থেকে ভাড়া মিটিয়ে চুপচাপ আরেকটি রিক্সায় চাপি। চারটায় “ওয়েসিস”-এ পৌছানোর কথা। এখন বাজে তিনটা পন্চাশ।
আমার ঘড়িতে যখন কাঁটায় কাঁটায় চারটা এক, তখন আমি ওয়েসিস পোছাই। কিন্তু প্রতিদিনকার নির্দিষ্ট টেবিলটা (প্রায়) ফাঁকা। ‘ও’ নেই। নিজের মনে একটু হাসি। সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আমি বরাবরই প্রচন্ড পাঙ্চুয়াল, হাজার হোক রোশনী একজন ‘সিভিলিয়ান’। তার দেরী হতেও পারে। দেরীর জন্য মনে মনে তাকে ক্ষমা করার স্বর্গীয় আনন্দে সময় গুনতে থাকি বসে বসে।
মিনিট দুই না যেতেই হাজির হল ও’। সশব্দে চেয়ার টেনে সামনে বসল। চেহারাটা গম্ভীর। অনুমান ভুল না হলে, তার অপূর্ব নাকটার দু’পাশের ত্বক সামান্য কুঁচকে থাকার কারনটা সম্ভবত ‘কিছুটা’ বিরক্তি। বুঝলাম, সামথিং ইজ রঙ।
“কেমন আছ, রোশনী?” মিষ্টি হাসি দেই ( অবশ্য রোদে পোড়া, ভাঁজ খাওয়া চেহারায় সেই হাসির মিষ্টতা নিয়ে কারও সন্দেহ জাগলে আমি দায়ী নই )।
“দেরী করলে কেন?”, নির্লিপ্ত প্রশ্ন।
“মানে ?! বরং তুমিই তো.. না মানে রিক্সা… মানে … দেখ মাত্র…” অবাক এবং ঝাঁঝাল অনুভূতির মিশ্রনটা এক নিমিষে ভ্যাবাচ্যাকায় রুপান্তরিত হয় দুইটা জিনিস খেয়াল হওয়ায়। ওভারকনফিডিন্সের জন্য আমি ঘড়িটাকে পাঁচ মিনিট স্লো রাখি, দ্বীতিয়ত, টেবিলের পাশে আগে থেকেই নিরীহভাবে পড়ে থাকা ব্যাগটা আমি চিনতে পেরেছি।
“তোমার দেরী দেখে আমি ফোন করি। তুমি বেরিয়ে এসেছ শুনে আবার ফিরে আসলাম। আচ্ছা, তুমি কবে একটু পাঙ্চুয়াল হবে, বলেতো ?”, এটকু বলে সে তার লোভনীয় ঠোঁটের বাম কোনাটা সামান্য প্রসারিত করে। আসলে, বোধহয় এটা প্রসারন নয়, এটি একটি মিষ্টি হাসি। ডিফেন্স অফিসারদের স্ত্রীর মর্যাদা এক Rank সিনিয়র ধরা হয়, অদূর ভবিষ্যতে রোশনীর যোগ্যতা বোধহয় আমার থেকে অন্তত দুই rank ওপরেই হবে। ও’র জন্য গর্বে আমার বুকটা ফুলে ওঠে। কিন্তু পরক্ষনেই আবার চুপসে যায় তার কথায়—-
“আজ কিন্তু আমি ছয়টা পর্যন্ত থাকব”।
সময় হিসেবে বিকেল ছয়টা হয়ত তেমন গুরুত্বপূর্ন নয়, তবে এটা হল সেই সময় যখন আসাদ স্যার ভাবীকে আনতে শহরে যায়। কাঁটায় কাঁটায় ছয়টা বাজতে রোশনী উঠল।
“চল, আমাকে একটু এগিয়ে দাও”
“দেখ , ইয়ে, আমার একটা সমস্যা আছে এখন”
দুই সেকেন্ড নিরব বিরতি।
“তাই নাকি, কি সমস্যা ?” গলার স্বরে যুগপত বরফের কাঠিন্য ও শীতলান।
“না, মানে, এক স্যার, মানে এখনই….” বুঝিনা, এত নার্ভাস হয়ে যাই কেন ওর সামনে। অথচ অফিসার হিসেবে আমি কিন্তু …. বুঝতেই পারছেন।
“আচ্ছা,থাক তাহলে। যখন এতই ভয় পাচ্ছ তুমি তাহলে এখানেই চুপচাপ বসে থাক, আমি চল্লাম। ও হ্যাঁ, এক ঘন্টার আগে বেরিও না কিন্তু।”, একটা হান্ড্রেড পার্সপন্ট ভুবনমোহিনী হাসি উপহার দিয়ে বল্ল। গলার স্বরটাও যেন একটু বেশি মিষ্টিই লাগল। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোলাগায় মনটা অাপ্লুত হত যাচ্ছিল প্রায়… হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। সুগার কোটেট কুইনিন ক্যাপসুল গিলতে গিয়ে মুখের ভেতরেই যেন ভেঙ্গে গেল। আমার সুপার সেনসিটিভ অনুভূতি জানান দিল মিষ্টি প্রলেপের ভেতর আছে কুইনিনের মত সূক্ষ অপমানের ছোঁয়া। আর, আপনারা এতক্ষনে নিশ্চই টের পেয়েছেন, আনার Ego এবং ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত প্রবল।
চিন্তা করে বের করি, ওয়েসিস থেকে ঠিক বিশ পা এগোলেই ওর নানার বাড়ি যাবার গলি, যেখানে ও’ এখন যাবে। ইনশাল্লাহ পার পেয়ে যাব।
“আশ্চর্য, তুমি যে কি বল না!! কিসের ভয়? চল”, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দৃপ্ত উত্তর আমার।
বেরিয়ে আসি খোলা রাস্তার ধূলিময় মুক্ত বাতাসে। ওর সুকোমল হাতটা ধরে আবেগঘন দশ পা এগোনোর পর হঠাৎ আমার অভিজ্ঞ চোখের কোনে কি যেন ধরা পড়ে। তাকিয়ে দেখি দ্রুত অগ্রসারমান একটা কালচে ধূসর হেলমেট। T-37 জেট প্লেনের ডুয়াল ককপিটের পাশাপাশি আসনে আসাদ স্যারকে সবসময় ধূসর হলেমেট পরা অবস্থাতেই দেখি। চিনতে তাই একমুহুর্তও দেরী হলনা।
গত দু’বছেরে কঠোর প্রশিক্ষন আর পেশাগত শৃংখলার পুরস্কার হিসেবে গড়ে ওঠা সহজাত রিফ্লেক্স আমাদের অহংকার। ঝট করে ডান পায়ে মাটিতে ধাক্কা দিয়ে, বাম পা’টা ব্যালে ড্যান্সের ভঙ্গিমায় এগিয়ে দিয়ে নিমেষেই পাশের দোকানে শরীরটা ঢুকিয়ে দেই অপূর্ব দক্ষতায়। তবে সব মহান কর্মেরই ছোট্ট কোন ত্রুটি থাকা স্বাবাবিক, আমার এই সুনিপুন কর্মটাও এর ব্যতিক্রম নয়। আমার ডান পা’টা নিরাপদে মাটি স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহুর্তে দরজার কোনে একটু বেধে যায়। যে কারনে হীট সীকার মিজাইলের মত নিক্ষিপ্ত হই কাউন্টারের ওপর। উপুড় হয়ে। এই সামান্য শব্দ সহ। এটা দেখে অভিভূত হয়ে কো আঁতেল সাহিত্যিক হয়ত বর্ননা দিতেন, “বিকট শব্দযোগে অমসৃন ভূপাতন”। কিন্তু আমি একজনা দ্বায়িত্ববার, বিশিষ্ট সামরিক কর্মকর্তা, সাহিত্যিক নই।
দোকানী তার চোখমুখ উজ্জল করে জিজ্ঞস করল, “কে মরিছে ভাই? ক্যাম্ভায়? খুব দুরুতো সার্ভিস লাগবে, বুঝতে পারিছি, কুন পরোব্লেম নাই, আমার কাছে আগর বাতি, কাফন, খাটিয়া….”। টুপি পরা ভদ্রলোকের থুতনীতে ঝুলন্ত মুঠো পরিমান দাড়ির শিল্পিত কাঁপন থেকে চোখ সরিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারি এটা “আখেরী বিদায়” জাতীয় দোকান।
দ্রুত সমালে উঠি আমার এই “আকস্মিক অনভিপ্রেত ভারসাম্যহীনতা জনিত বিহ্বলতা” থেকে। অভ্যস্ত হাতে বাঁকা হয়ে ঝুলে থাকা সানগ্লাসটা নাকের ওপর সোজা করে পুন:স্থাপন করি। দুহাত পকেটে পুরে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে আসি। রোশনীকে বোঝানোর জন্য স্মার্টলী বলা শুরু করি,
” একচুয়ালী, ব্যাপারটা হল, ইন্সটিঙ্কটিভ রিফ্লেক্স, তুমি তো জানই এজ এ ডিফেন্স অফিসার…. ” মাঝ পথে থেমে যাই। সামনে রোশনী নেই। চলে গেল নাকি ?! বড় আশা নিয়ে ডান দিকে ফিরি, তার পথের দিকে। নেই। দিগুন আশা নিয়ে ধীরে ধীরে বাম দিকে তাকাই।
অতি পরিচিত কাঠামোটা দেখতে পাই। হাতের ইশারায় ডাকছে। আবেগের তীব্রতায় বুঝি একটা বিট মিস্ও করি। তবে প্রবল এই অনুভূতির উচ্ছাসকে ঠিক “ভালোলাগা” না বলে নিখাদ আতঙ্ক বলে সংজ্ঞায়িত করাই বোধহয় বেশি যুক্তিযুক্ত। আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা মুক্ত করে রওনা দেই বাইকে বসা আসাদ সারের দিকে।
Posted by Aman